মুজতাহিদ ও মাজহাবঃ কিছু ভ্রান্ত প্রশ্ন ও আমাদের জবাব

✴ মুজতাহিদ হতে হলে ন্যূনতম পাঁচটি বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য।
.
মাজহাব মানার  আবশ্যকতা ও কিছু বিভ্রান্তি নিরসন :
মুজতাহিদ ও মাজহাবঃ কিছু ভ্রান্ত প্রশ্ন ও আমাদের জবাব
?কেন স্বাধারণ মানুষ নিজে নিজে ডাইরেক্ট কুরান হাদিস থেকে মাসয়ালা উদ্ভাবন করতে পারেন না??
ফলে মাযহাব এর অনুসরণ করতে বাধ্য হন।
?.
শুরুকথা

■ইসলামী শরীয়তে, মুজতাহিদ ফীশ শরীয়তের রায় বা মতকে মাযহাব বলে।
♢যেমন- ইমাম আবূ হানীফা, মালিক, শাফেয়ী, আহমাদ, লাইছ, সুফিয়ান সওরী, আওযায়ী প্রমুখ (আলাইহির রাহমাহ)। মুজতাহিদ ফীশ শরীয়ত হচ্ছে, যেসব মুজতাহিদ ইজতিহাদের নীতিমালা নির্ধারণ করেছেন। মাযহাবের শাব্দিক অর্থ মত, পথ, রায়, স্কুল ও ধর্ম ইত্যাদি। প্রচলিত চার মাযহাব মান্য করা ওয়াজিব। উম্মাহ’র মুতায়াখখিরীন ইমামগণের ইজমা (সম্মিলিত সিদ্ধান্ত) অনুসারে এটি ওয়াজিব।
¤
মাযহাবের গুরুত্ব :
¤
মাযহাব ছাড়া পূর্ণ দ্বীন মানা সম্ভব নয়, তাই চার মাযহাবের যে কোনো একটি মাযহাব মানা আবশ্যক। যেমন দুই রাকাত নামায মাযহাবের অনুসরণ ছাড়া আদায় করা অসম্ভব। উদাহরণত –
■১-《》রুকু করা ফরজ কুরআন দ্বারা প্রমাণিত।
¤
¤২-《》রুকুর তাসবীহ পড়া সুন্নত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।
¤
¤৩-《》রুকুতে গমণের সময় ইমাম জোরে তাকবীর বলে আর মুসল্লি আস্তে তাকবীর বলে। এ মাসআলা কুরআন ও হাদীসের কোথাও নেই। অথচ তা নামাযের মাসআলা। ইমাম যে জোরে তাকবীর বলে, আর মুসল্লি সর্বদা আস্তে আস্তেই তাকবীর বলে এভাবে আমল করার দ্বারা নামায শুদ্ধ হচ্ছে কি না? তা কুরআন ও হাদীসের কোথাও নেই। এর সমাধান মাযহাবের ইমামদের ইজমা তথা ঐক্যমত্ব দ্বারা প্রমানিত হয়েছে।
¤
¤৪-《》রুকুতে গিয়ে যদি কেউ ভুল তাকবীর না বলে, রুকুর তাসবীহের বদলে কেউ সেজদার তাসবীহ বলে ফেলল, তাশাহুদের বদলে সূরা ফাতিহা পড়ে ফেললো, জোরে কিরাতের স্থলে আস্তে কিরাত পড়ল, আস্তের স্থলে জোরে পড়ল এসব মাসআলার সমাধান ছাড়াতো সহীহ পদ্ধতিতে নামায পড়া সম্ভব নয়।
《》 আর এসব মাসআলাসহ নামাযের অসংখ্য মাসায়েলের সমাধান না কুরআন দ্বারা প্রমাণিত, না হাদীস দ্বারা প্রমানিত; বরং এসব সমাধান মাযহাবের ইমামগণ কুরআন ও হাদীসের গভীর থেকে মূলনীতি বের করে এর আলোকে উদ্ভাবন করেছেন। আর তাদের উদ্ভাবিত সেসব মাসআলার নামই হল “মাযহাব”।

《》এই তো গেল শুধু নামাযের একটি ছোট্ট অংশের উদাহরণ। এমনিভাবে মানুষের জীবনঘনিষ্ট এমন অসংখ্য মাসআলার উপমা পেশ করা যাবে, যার সরাসরি কোনো সমাধান কুরআন ও হাদীসে নেই। কিংবা অনেক স্থানেই বাহ্যিক বিরোধপূর্ণ। তাই মাযহাব মানা ছাড়া সাধারণ মুসলমানদের কোনো গত্যান্তর নেই। অন্তত দুই রাকাত ও পূর্ণ করে পড়ার জন্য প্রতিটি মুসলমান মাযহাবের প্রতি মুখাপেক্ষী। তাই যেহেতু মাযহাব ছাড়া দুই রাকাত নামাযও পড়া যায় না, পূর্ণ দ্বীন মানা তো বহু দূরের কথা, তাই গায়রে মুজতাহিদ (মুজতাহিদ নন এমন) ব্যক্তিদের জন্য মাযহাব মানতে হবে। মনে রাখতে হবে, মুজতাহিদ হবার জন্য ন্যূনতম পাঁচটি বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য। যাদের নিকট এগুলো নেই তারা মুকাল্লিদ হিসেবে স্বীকৃত মুজতাহিদের ব্যাখ্যা মেনে নিয়ে আমল করবে।
.
এবার মূল আলোচনা :

✔ মুজতাহিদ হবার জন্য ন্যূনতম যে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য থাকা অপরিহার্য তা দলিল সহকারে সংক্ষেপে তুলে ধরছি।
ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ ও সর্বজনগৃহীত মুহাক্কিক শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবী (রহ.) প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম বাগাবী (রহ.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইজতিহাদের জন্য পাঁচটি শর্ত রয়েছে। যার মধ্যে এ পাঁচটি বৈশিষ্ট্য হতে একটিও কম থাকবে, তার জন্য কোনো মুজতাহিদ ইমামের গবেষণালব্ধ ফতুয়ার তাক্বলীদ করা ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ নেই।
(সূত্র: কাঞ্জুল উসূল ইলা মা’রিফাতিল উসূল- ২৭০, উসূলে ফিক্বাহ লি আবি হুরায়রা- ২৩৬, আল মালাল ওয়ান নাহাল- ১/২০০ ; মিশরী ছাপা)।
✴.
শর্তাবলী :
¤
✴১-《》কোরআনের কোন আয়াত কখন নাজিল হয়, কোন আয়াত নাছেখ (রহিতকারী), কোন আয়াত মানছুখ (রহিত), কোন আয়াত মুজমাল (সংক্ষিপ্ত), কোন আয়াত মুতাশাবেহ ইত্যাদি বিষয়গুলো সবিস্তারে জানার সাথে সাথে কোরআনের নিগুঢ় তথ্যগুলোর সঠিক মর্মগুলি বুঝার পূর্ণ জ্ঞান থাকা।

✴২-《》পবিত্র ত্রিশ পারা কোরআনের ব্যাখ্যায় রাসূলেপাক (সা) কর্তৃক রেখে যাওয়া দশ লক্ষ হাদীস সনদের ভিন্নতাসহ জানা আবশ্যক। আর হাদীসের এ বিশাল ভান্ডার থেকে কমপক্ষে যেসব হাদীস দ্বারা শরীয়তের বিধি-বিধান সাব্যস্ত হয়, সেসব হাদীস সনদ (বর্ণনাকারী), মতন (মূল বিষয়) এবং উক্ত হাদীস সমূহের বর্ণনাকারীদের জীবন ইতিহাস (সাহাবা ও তাবেয়ীনদের জীবনাচার) সহ কন্ঠস্থ থাকা। পাশাপাশি হাদীসের নিগুড় তথ্যাদি, সঠিক মর্মকথা বুঝার পূর্ণ জ্ঞান থাকা। যাতে করে মতবিরোধ বিশিষ্ট মাসআলা সমূহে কোরআন, হাদীস, সাহাবা ও তাবেয়ীনদের নির্দেশিত সীমা অতিক্রম না হয়ে যায়।
✴.
✴৩-《》মুজতাহিদ আরবী ভাষা সম্পর্কে দক্ষ ও অভিজ্ঞ হওয়া। কেননা কোরআন ও হাদীস উভয়টি আরবী ভাষায়। তাই আরবী ভাষা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা ছাড়া ইজতিহাদ তো দূরের কথা, শুধু কোরআন-হাদীসের অর্থ বুঝাও সম্ভবপর নয়। আরবী ভাষায় দক্ষতা অর্জনের জন্য আরবী আভিধানিক অর্থ ও পারিভাষিক অর্থ, নাহু- ছরফ, উসূল, বালাগাতের পূর্ণ দক্ষতা অপরিহার্য।
.
✔৪-<>মুজতাহিদ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বুদ্ধিমত্তা ও অন্তর্দৃর্ষ্টি দ্বারা বিশেষভাবে ভূষিত হয়ে অত্যাধিক স্মরণশক্তি ও জ্ঞান সম্পন্ন হওয়া। মুজতাহিদের জন্য কেবল সাধারণ বুদ্ধিমত্তাই যথেষ্ট নয়। সাধারণ বুদ্ধিমত্তা তো সকল আলেমেরই থাকে।
■এতে মুজতাহিদদের বিশেষ গুরুত্ব আর রইল কোথায়? মুজতাহিদ তাক্ওয়া ও খোদাভীতি সম্পন্ন হতে হবে। তাকে কখনও মনপূজারী হওয়া চলবে না।
.
✔৫-<>ইজতিহাদ ও মাসআলা চয়নের প্রক্রিয়া সমূহের উপর পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখা। (সূত্র : তাফসীরে আহমদী, পৃষ্ঠা- ১০১)

শায়খ ইবনে তাইমিয়াহ (রহ)-এর পরামর্শ :

শায়খ ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) [মৃত ৭২৮ হিজরী]- এর এ উক্তিটি সবার মনে রাখা দরকার। তিনি লিখেন :
°
ﻭﻣﻦ ﻇﻦ ﺑﺄﺑﻰ ﺣﻨﻴﻔﺔ ﺃﻭ ﻏﻴﺮﻩ ﻣﻦ ﺃﺋﻤﺔ ﺍﻟﻤﺴﻠﻤﻴﻦ ﺃﻧﻬﻢ ﻳﺘﻌﻤﺪﻭﻥ ﻣﺨﺎﻟﻔﺔ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺍﻟﺼﺤﻴﺢ ﻟﻘﻴﺎﺱ ﺃﻭ ﻏﻴﺮﻩ ﻓﻘﺪ ﺃﺧﻄﺄ ﻋﻠﻴﻬﻢ، ﻭﺗﻜﻠﻢ ﺇﻣﺎ ﺑﻈﻦ ﻭﺇﻣﺎ ﺑﻬﻮﻯ
°
অর্থাৎ যে ব্যক্তি ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) অথবা মুসলমানদের অন্য কোনো ইমামের ব্যাপারে এ ধারণা পোষণ করে যে, তারা ক্বিয়াস কিংবা অন্য কোনো কারণে ‘সহীহ হাদীস’ ছেড়ে দিয়েছেন, তবে সে তাঁদের ওপর ভ্রান্ত বিষয় আরোপ করল এবং নিজের ধারণা অথবা প্রবৃত্তি তাড়িত হয়ে তাঁদের ওপর মিথ্যারোপ করল”

[সূত্র : মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড-২০, পৃষ্ঠা-৩০৪]।

■ইমাম আহমদ (রহ)-এর বক্তব্য :
.
হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হল, যার এক লক্ষ হাদীস স্মরণ থাকে, সে কি ফক্বীহ বা মুজতাহিদ হতে পারবে? তদুত্তরে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বললেন, না।
.
পুনরায় জিজ্ঞাসা করা হল, যদি পাঁচ লক্ষ হাদীস স্মরণ থাকে, তখন? ▪তদুত্তরে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল বললেন, সে সময় তাকে ফক্বীহ বলা হবে আশা করা যেতে পারে। (সূত্র: এমদাদুল ফাতওয়া- ৪/৮৭)।
¤
মন্তব্য :
¤
উপরুল্লিখিত দীর্ঘ আলোচনা দ্বারা বুঝা গেল, কুরান হাদিসের উপর সঠিক ভাবে আমল করার জন্য দুটি পথই খোলা আছে।
■ (এক) নিজে বিজ্ঞ মুজতাহিদ হওয়ার যোগ্যতা লাভ করা। নতুবা
■(খ) বিজ্ঞ কোনো মুজতাহিদ ইমামের ফতুয়া মেনে আমল করা। আর আমাদের জন্য দ্বিতীয় পথটিই খোলা এবং বেশি নিরাপদ।
.
কতিপয় কানকাটা আহলে (আলাদা) হাদিস “মাযহাব” মানাকে বিদয়াতের সাথে তুলনা করে। যা চরম গোমরাহি বৈ কিছু না।
.
কেননা, যদি মাযহাব মান্য করার কারণে কেউ বিদয়াতি হত, তাহলে “সিহাহ সিত্তার” সম্মানিত সংকলক (ইমাম বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসায়ী, তিরমিজি ও ইবনে মাযা) সহ সকল মাযহাবি ইমামগণ এবং হারামাইনিশ শারিফাইনের সম্মানিত ইমামদ্বয় উনারা সবাই বিদয়াতি হবেন না কিজন্য??
♢ অথচ তারাও উনাদেরকে বিদয়াতি বলেননা! তাহলে পরবর্তী যুগের মাযহাব অনুসারিরা বিদয়াতি হলেন কিভাবে?

আসলে যারা মাযহাব বিরুদি তারা এখনো পর্যন্ত নিজেদের পরিচয়টুকু সঠিক করে বলতে পারেনা। এমনকি তারা প্রকৃতপক্ষে কী চাচ্ছে আর পরিণতি কোন দিকে যাচ্ছে তা থেকেও বেখবর ! আজ এটা বলছে তো কাল ওটা। এ হল কথিত আহলে হাদিসদের যথেচ্ছা নিত্য নতুন ওয়াসওয়াসা।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাদের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচার ও হক বুঝার তাওফিক দিন, আমীন।

সংগ্রহেঃ- মুফতি আঃরাজ্জাক কাসেমী,ভারত।

About الفقه الحنفي الفقه الاكبر

বিদগ্ধ মুফতিয়ানে কেরামের দ্বারা পরিচালিত , সকল বাতিলের মুখোশ উন্মোচনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ , উলামায়ে আহনাফ এবং হানাফি মাজহাবের অনুসারীদের সরবাধুনিক মুখপাত্র ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ডটকম। আমাদের কারয্যক্রমঃ- ক) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ডটকম । খ) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট অনলাইন রিচার্স সেন্টার । গ) বাতিলের মোকাবেলায় সারা দুনিয়া ব্যাপি ইসলামিক সেমিনার ঘ) এবং মুনাজারায় অংশগ্রহণ । ঙ) হোয়াটএ্যাপ্স, টেলিগ্রাম, ভাইবার & সোমা চ্যাট ম্যাসেঞ্জারে ফিকহে হানাফীঃপ্রশ্ন-উত্তর গ্রুপ। আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনাঃ- ক) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট অফলাইন রিচার্স সেন্টার । খ) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ইউনিভার্সিটি । গ) হানাফী টিভি সহ আরও বহুমুখি প্রকল্প। আমাদের আবেদনঃ- এই বহুমুখি এবং বিশাল প্রকল্প-এর ব্যয়ভার কারও একার পক্ষে বহন করা খুবই দুঃসাধ্য ব্যপার। সুতারাং আপনি নিজে ও আপনার হিতাকাংখি দ্বীনের খেদমতে আগ্রহী বন্ধুদের নিয়ে মাসিক/বাতসরিক ও এককালীন সদস্য হিসেবে সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করে এগিয়ে আসবেন ; এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সাহায্য পাঠাবার ঠিকানাঃ- ১) সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, বয়রা শাখা, খুলনা Account Name: Md. Hedaytullah Account No: 2704501011569 ২) বিকাশঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩ ৩) এমক্যাশঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩৬ ৪) ডি,বি,বি,এল/রকেটঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩৮ Express Money Transfer:- Name Hedaytullah ID NO 6512895339162 সার্বিক যোগাযোগঃ- মুফতি মুফাসসির হিদায়াতুল্লাহ শেখ মোবাঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩ fiqhehanafithegreat@gmail.com