মাজহাব কেন মানবো? ৫ম পর্বঃ

প্রচলিত মাযহাব ব্যক্তিবিশেষের মতের সমষ্টি নয়

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুণ!

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুণ!

তৃতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুণ!

চতুর্থ পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুণ!

মাজহাব কেন মানবো? ৫ম পর্বঃ

চার মাযহাবের কোনোটাই নির্দিষ্ট এক ব্যক্তির মতের সমষ্টির নাম নয়। বরং তার এলাকার পূর্ববর্তী সাহাবী ও ইমামগণের মতের সমষ্টি। এমনকি পরবর্তী আলেমগণও যাচাইবাছাই করে যখন আপন মাযহাবের মত দুর্বল মনে করেছেন, তখন অন্য মাযহাবের মতের উপর ফতোয়া দিয়েছেন। এভাবে ঐ ফতোয়াটিই মাযহাবের অগ্রগণ্য মতের মর্যাদা লাভ করেছে। যেমন হানাফী মাযহাবের অনেক মাসআলায় ইমাম আবু হানিফার মত অনুসারে ফতোয়া দেয়া হয় না, অন্য মত অনুসারে ফতোয়া দেয়া হয়।

সুতরাং একটি মাযহাবের অনুসরণ মানে এক ব্যক্তির অনুসরণ বা তাকলীদে শখসী নয়। বরং একটি ঘরানার বড় এক জামাতের ব্যাখ্যার অনুসরণ, যেখানে সাহাবী-তাবেঈ সবাই আছেন। যদিও মনে করা হয় এটা তাকলীদে শখসী তথা এক ব্যক্তির অনুসরণ।

ইতিহাসের গ্রহণযোগ্য কোনো আলেম তাকলীদ করতে বারণ করেননি

তাকলীদ হলো এই উম্মতের ইজমাঈ (সর্বজনস্বীকৃত) মাসআলা। সুতরাং যে ব্যক্তি তাকলীদ অস্বীকার করে, সে এই উম্মত থেকে বিচ্ছিন্ন মত লালন করে। সাহাবাযুগ থেকে যে জিনিস হালাল হিসাবে চলে আসছে, সেই হালালকে হারাম বলা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কী! তাকলীদ বিষয়ে ইনসাফের সাথে সিদ্ধান্তে পৌঁছার জন্য এই একটি কথাই যথেষ্ট যে, উম্মতের গ্রহণযোগ্য সকল আলেম যে বিষয় হালাল হবার ব্যাপারে একমত, সেটি হারাম হতে পারে না। এমন বিষয় অস্বীকার করা বিকৃত-রুচির পরিচায়ক।

ভেবে দেখুন, ইমাম আওযাঈ (মৃত্যু:১৫৭হি.) ও ইমাম মালেক (মৃত্যু:১৭৯হি.)-এর জীবদ্দশাতেই তাদের মাযহাব সাধারণ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলো। ইমাম বোখারীর বিশিষ্ট উস্তাদ, হাদীসের প্রসিদ্ধ ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন (মৃত্যু:২৩৩হি.) ছিলেন হানাফী মাযহাবের অনুসারী। (সিয়ারু আলামিন নুবালা, তরজমায়ে ইমাম মালেক)

তার মানে! সেই কবে থেকে মাযহাব একটি সুপরিচিত বিষয় চিন্তা করা যায়!

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, ‘চার মাযহাবের কোনো এক মাযহাব কারো পছন্দ হলে ঐ বিষয়ে আপত্তি করা অন্যের জন্য বৈধ নয়। যার কাছে শাফেঈ মাযহাব ভালো লাগে, সে মালেকী মাযহাব পছন্দ করে এমন কারো প্রতি আপত্তি করতে পারবে না। তেমনি কারো কাছে হাম্বলী মাযহাব ভালো লাগলে সে শাফেঈ মাযহাব বা অন্য কোনো মাযহাবের অনুসারীর প্রতি আপত্তি রাখতে পারবে না।’ (মাজমুআতুল ফাতাওয়া ২০/২৯২)

অন্য এক প্রসঙ্গে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. আরো বলেন, ‘মানুষের অবস্থা দুটি। হয় নিজে মুজতাহিদ হবে, নয়তো অন্য কারো তাকলীদ করবে। যদি কারো তাকলীদ করে, তবে প্রাথমিক যুগের কোনো ইমামের তাকলীদ করাই বাঞ্ছনীয়। কারণ প্রাথমিক যুগ পরবর্তী যুগ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ (মাজমুয়াতুল ফাতওয়া ২০/৯)

অর্থাৎ ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর মত হলো, যে ব্যক্তি মুজতাহিদ নয়, তাকে তাকলীদ করতে হবে। সেক্ষেত্রে পরবর্তী কালের যেমন তেমন কারো অনুসরণ না করে প্রাথমিক কালের কোনো ইমাম বিশেষত চার ইমামের কোনো একজনকে অনুসরণ করবে। কারণ একমাত্র চার ইমামের মাযহাবই তফসিলি তথা বিস্তারিত ভাবে সংরক্ষিত আছে এবং এর উপর যুগ যুগ ধরে আলেমগণের যাচাইবাছাই চলে আসছে।

ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর শাগরিদ ইবনুল কাইয়্যিম রহ.-এর মতে তাকলীদ কারো জন্য জায়েয (অনুমোদিত) আর কারো জন্য ওয়াজিব (অত্যাবশ্যকীয়)। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত শরীয়তের অনুসরণে একনিষ্ঠ, কিন্তু কিছু মাসআলা সে নিজে নিজে বের করতে পারছে না, সেক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি তার চে বড় কোনো আলেমের তাকলীদ করবে, এটা প্রশংসাযোগ্য, নিন্দাযোগ্য কোনো বিষয় নয়। সে বরং এর জন্য সওয়াবের অধিকারী হবে, গোনাহগার হবে না। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ‘তাকলীদে ওয়াজিব’ ও ‘তাকলীদে জায়েয’ এর অধীনে আসবে ইনশাআল্লাহ।’ (ই’লামুল মুওয়াক্কিঈন ২/১৮৮)

প্রখ্যাত সৌদি আলেম শায়খ সালেহ আল ফাউযান লিখেছেন, ‘…ভেবে দেখুন! মুহাদ্দিসগণের মাঝে এঁরা হলেন একেকজন বড় বড় ইমাম। এঁরা সবাই মাযহাব মানতেন। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (মৃত্যু:৭২৮হি.) ও ইবনুল কাইয়্যিম (মৃত্যু:৭৫১হি.) ছিলেন হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী। ইমাম নববী (মৃত্যু:৬৭৬হি.) ও ইবনে হাজার আসকালানী (মৃত্যু:৮৫২হি.) ছিলেন শাফেঈ মাযহাবের অনুসারী। ইমাম তাহাবী (মৃত্যু:৩২১হি.) হলেন হানাফী মাযহাবের অনুসারী। ইমাম ইবনু আব্দিল বার (মৃত্যু:৪৬৩হি.) হলেন মালেকী মাযহাবের অনুসারী। (ইআনাতুল মুস্তাফীদ ১/১২)

শায়খ মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নজদী (মৃত্যু:১২০৬হি.) হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি ও তার অনুসারীগণ বলতেন, ‘সাধারণ মানুষ চার ইমামের কোনো এক ইমামের মাযহাব মানতে বাধ্য বলে আমরা বিশ্বাস করি।’ (আদ-দুরারুস সানিয়্যাহ ১/২৭৭)

মুহাদ্দিসগণের কর্মধারা ও মাযহাব

হিজরি চতুর্থ শতক থেকে যত আলেম মুহাদ্দিস এই উম্মতের মাঝে পয়দা হয়েছেন, তাদের সকলে সুনির্দিষ্ট কোনো মাযহাবের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কেউ শাফেঈ কেউ মালেকী, কেউ হানাফী কেউ হাম্বলী। কোরআন-হাদীসের অনুসরণে মাযহাব মানার পদ্ধতি সঠিক ও যথার্থ প্রমাণিত হবার জন্য এই এক দলিলই যথেষ্ট। মনে রাখতে হবে, এই পদ্ধতির অনুসরণের মাঝে মানুষের দ্বীন ও ঈমান হেফাজতের রহস্য নিহিত। সুনির্দিষ্ট মাযহাবের অনুসারী প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণের একটি ক্ষুদ্র তালিকা নিম্নরূপ:

১. ইমাম মুযানী (মৃত্যু:২৬৪হি.)

২. মুহাদ্দিস আবু বকর খাল্লাল (মৃত্যু:৩১১হি.)

৩. ইবনুল মুনযির (মৃত্যু:৩১৮হি.)

৪. ইমাম তাহাবী (মৃত্যু:৩২১হি.)

৫. মুহাদ্দিস রামাহুরমুযী (মৃত্যু:৩৬০হি.)

৬. ইমাম দারাকুতনী (মৃত্যু:৩৮৫হি.)

৭. ইমাম খাত্তাবী (মৃত্যু:৩৮৮হি.)

৮. মুহাদ্দিস আবু নুআইম (মৃত্যু:৪৩০হি.)

৯. ইমাম বায়হাকী (মৃত্যু:৪৫৮হি.)

১০. ইমাম ইবনু আব্দিল বার (মৃত্যু:৪৬৩হি.)

১১. খতীব বাগদাদী (মৃত্যু:৪৬৩হি.)

১২. মুহাদ্দিস ইবনে মান্দাহ (মৃত্যু:৪৭৫হি.)

১৩. মুহাদ্দিস ইবনে মাকুলা (মৃত্যু:৪৭৫হি.)

১৪. ইমাম বাগাবী (মৃত্যু:৫১০হি.)

১৫. মুহাদ্দিস কাযী ইয়ায (মৃত্যু:৫৪৪হি.)

১৬. মুহাদ্দিস ইবনে আসাকির (মৃত্যু:৫৭১হি.)

১৭. মুহাদ্দিস ইবনুল জাওযী (মৃত্যু:৫৯৭হি.)

১৮. মুহাদ্দিস জিয়া আল মাকদিসী (মৃত্যু:৬৪৩হি.)

১৯. মুহাদ্দিস ইবনুল সালাহ (মৃত্যু:৬৪৩হি.)

২০. ইমাম মুনযিরী (মৃত্যু:৬৫৬হি.)

২১. ইমাম নববী (মৃত্যু:৬৭৬হি.)

২২. শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (মৃত্যু:৭২৮হি.)

২৩. ইমাম বিরযালী (মৃত্যু:৭৩৯হি.)

২৪. ইমাম ইবনু আব্দিল হাদী (মৃত্যু:৭৪৪হি.)

২৫. খতীব তাবরীযী (মৃত্যু:৭৪৮হি.)

২৬. ইমাম যাহাবী (মৃত্যু:৭৪৮হি.)

২৭. ইবনুল কাইয়্যিম (মৃত্যু:৭৫১হি.)

২৮. মুহাদ্দিস তকী উদ্দীন সুবকী (মৃত্যু:৭৫৬হি.)

২৭. ইমাম যাইলাঈ (মৃত্যু:৭৬২হি.)

২৯. মুহাদ্দিস তাজুদ্দীন সুবকী (মৃত্যু:৭৭১হি.)

৩০. মুহাদ্দিস ইবনে কাছীর (মৃত্যু:৭৭৪হি.)

৩১. মুহাদ্দিস ইবনে রজব (মৃত্যু:৭৯৫হি.)

৩২. ইমাম যাইনুদ্দীন ইরাকী (মৃত্যু:৮০৬হি.)

৩৩. মুহাদ্দিস ইবনে হাজার আসকালানী (মৃত্যু:৮৫২হি.)

৩৪. মুহাদ্দিস সাখাবী (মৃত্যু:৯০২হি.)

৩৫. মুহাদ্দিস জালালুদ্দীন সুয়ূতী (মৃত্যু:৯১১হি.)

৩৬. মুহাদ্দিস ইবনে হাজার হায়ছামী (মৃত্যু:৯৭৪হি.)

৩৭. মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নজদী (মৃত্যু:১২০৬হি.) প্রমুখ এই উম্মাহর গর্বের ধন মুহাদ্দিসীনে কেরাম। এছাড়া আরও কতজনের নাম ইচ্ছা করলেই উল্লেখ করা যায়। যারা সকলে আপন আপন সময়ে হাদীসের ইমাম ছিলেন। এদের হাতেই হাদীস ও ফিকাহ-শাস্ত্র বিকাশ লাভ করেছে। আর এরা সকলে ছিলেন মাযহাবপন্থী। সুতরাং মুহাদ্দিসীনে কেরামের কর্মপন্থা হলো মাযহাব অনুসরণ, বিরোধিতা নয়। আর তাই আমাদের কালের আহলে হাদীস ভাইদেরও মাযহাব মেনেই চলা উচিৎ, বিরোধিতা করে নয়।

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের গ্রহণযোগ্য কোনো আলেম ইনসাফ ও ভারসাম্যের সাথে চার মাযহাবের কোনো এক মাযহাব অনুসরণে বাধা দেননি। সুতরাং আজ যারা বাধা দিচ্ছে, তারা পূর্ববর্তী সকল আলেমের বিরুদ্ধাচারী। ইবনে কাছীর, যাহাবী, ইবনে রজব, ইবনু আব্দিল হাদী এমনকি ইবনে তাইমিয়া, ইবনুল কাইয়িম এবং শেষ যামানার মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নজদীসহ সর্বস্তরের আলেমের কর্মপন্থাত্যাগী। তবে কি বলতে চান, এরা কেউ দ্বীন বুঝেননি এবং এমন জিনিসকে তারা জায়েয মনে করেছেন, যা হারাম এবং শিরক! সুতরাং পূর্ববর্তী সকল আলেম ও সাধারণ মুসলমান মুশরিক! সুবহানাল্লাহ! এর চে জঘন্য খারেজী (বিদ্রোহী) মনোবৃত্তি আর কী হতে পারে! আল্লাহ সবাইকে হেফাজত করুন। আমীন।

চলবে —————————–

About الفقه الحنفي الفقه الاكبر

বিদগ্ধ মুফতিয়ানে কেরামের দ্বারা পরিচালিত , সকল বাতিলের মুখোশ উন্মোচনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ , উলামায়ে আহনাফ এবং হানাফি মাজহাবের অনুসারীদের সরবাধুনিক মুখপাত্র ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ডটকম। আমাদের কারয্যক্রমঃ- ক) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ডটকম । খ) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট অনলাইন রিচার্স সেন্টার । গ) বাতিলের মোকাবেলায় সারা দুনিয়া ব্যাপি ইসলামিক সেমিনার ঘ) এবং মুনাজারায় অংশগ্রহণ । ঙ) হোয়াটএ্যাপ্স, টেলিগ্রাম, ভাইবার & সোমা চ্যাট ম্যাসেঞ্জারে ফিকহে হানাফীঃপ্রশ্ন-উত্তর গ্রুপ। আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনাঃ- ক) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট অফলাইন রিচার্স সেন্টার । খ) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ইউনিভার্সিটি । গ) হানাফী টিভি সহ আরও বহুমুখি প্রকল্প। আমাদের আবেদনঃ- এই বহুমুখি এবং বিশাল প্রকল্প-এর ব্যয়ভার কারও একার পক্ষে বহন করা খুবই দুঃসাধ্য ব্যপার। সুতারাং আপনি নিজে ও আপনার হিতাকাংখি দ্বীনের খেদমতে আগ্রহী বন্ধুদের নিয়ে মাসিক/বাতসরিক ও এককালীন সদস্য হিসেবে সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করে এগিয়ে আসবেন ; এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সাহায্য পাঠাবার ঠিকানাঃ- ১) সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, বয়রা শাখা, খুলনা Account Name: Md. Hedaytullah Account No: 2704501011569 ২) বিকাশঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩ ৩) এমক্যাশঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩৬ ৪) ডি,বি,বি,এল/রকেটঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩৮ Express Money Transfer:- Name Hedaytullah ID NO 6512895339162 সার্বিক যোগাযোগঃ- মুফতি মুফাসসির হিদায়াতুল্লাহ শেখ মোবাঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩ fiqhehanafithegreat@gmail.com