মাজহাব কেন মানবো? ৩য় পর্বঃঃ

তাবেয়ীগণের মাজহাব কি ছিলোঃঃ

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুণ।

দ্বিতীয় পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করু।।

মাজহাব কেন মানবো? ৩য় পর্বঃ

তাবেয়ীরা যেই সকল এলাকায় থাকতেন, সেই সকল এলাকার বিজ্ঞ সাহাবীদের বা বিজ্ঞ মুজতাহিদের মত তথা মাযহাবের অনুসরণ করতেন। তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য ছিলেন-
হযরত সাঈদ বিন মুসায়্যিব রহঃ, হযরত আবু সালমা বিন আব্দির রহমান রহঃ, হযরত ওরওয়া বিন জুবাইর রহঃ হযরত কাসেম বিন মুহাম্মদ রহঃ, হযরত সুলাইমান বিন ইয়াসার রহঃ, হযরত খারেজা বিন জায়েদ রহঃ প্রমূখবৃন্দ।
তারপর মদীনায় যাদের মত তথা মাযহাবের অনুসরণ করা হত তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য হল-হযরত ইমাম জুহরী রহঃ, হযরত ইয়াহইয়া বিন সাঈদ রহঃ, হযরত রাবিয়া বিন আব্দির রহমান রহঃ।
আর মক্কা মুকার্রমায় ছিলেন আতা বিন আবি রাবাহ রহঃ, আলী বিন আবি তালহা রহঃ, আব্দুল মালিক বিন জুরাইজ রহঃ প্রমূখ।
আর কুফায় ছিলেন হযরত ইবরাহীম নাখয়ী, আমের বিন শুরাহবীল, শা’বী, আলকামা, আল আসওয়াদ রহঃ।
আর বসরায় ছিলেন-হাসান বসরী রহঃ। ইয়ামানে হযরত তাওস বিন কায়সান রহঃ। শামে হযরত মাকহুল রহঃ প্রমূখ।
যাদের ফাতওয়া বিধৃত হয়েছে-মুয়াত্তাগুলোতে। মুসনাদগুলোতে, আর সুনানগুলোতে, যেমন মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, কিতাবুল আসার, শরহু মায়ানিল আসার ইত্যাদী গ্রন্থে। {উসুলুল ইফতা লিত তাক্বী উসমানী দাঃবাঃ} ৷

মুহাদ্দিসগণ কি কোনো মাজহাব মেনেছেনঃঃ

এই কথাটি বুঝার আগে একটি কথা আগে বুঝে নিন। সেটা হল-রাসূল সাঃ এর যুগ থেকেই দু’টি দল চলে আসছে, একটি দল হল যারা ইজতিহাদ তথা উদ্ভাবনী ক্ষমতার অধিকারী। তারা ইজতিহাদ করতেন তথা মত দিতেন বিভিন্ন বিষয়ে। আর একদল ছিলেন যাদের এই ক্ষমতা ছিলনা, তারা সেই মুজতাহিদদের মতের তথা মাযহাবের অনুসরণ করতেন।
ঠিক একই অবস্থা ছিল সাহাবাদের যুগে। একদল ছিল মুজতাহিদ, যাদের একটি তালিকা ইতোপূর্বে উল্লেখিত হয়েছে। আর বিশাল এক জামাত ছিল যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন না। তারা সেই সকল মুজতাহিদদের মাযহাব তথা মতের অনুসরণ করতেন। তেমনি তাবেয়ীদের একই অবস্থা ছিল, একদল মুজতাহিদ, আরেকদল মুকাল্লিদ তথা অনুসারী। এমনি মুহাদ্দিসীনদের মাঝেও দুই দল ছিল, একদল ছিল যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন, আরেকদল ছিল যারা ইজতিহাদের ক্ষমতা রাখতেন না। তাই তাদের মাঝে কারো কারো মাযহাব রয়েছে কারো কারো নেই। কেউ কেউ নিজেই মাসআলা বের করেছেন, কেউ কেউ অন্য কোন ইমামের অনুসরণ করেছেন।
যেমন ইমাম বুখারী মুজতাহিদ ছিলেন, তাই তার কারো অনুসরণের দরকার নাই। তবে কেউ কেউ তাকে শাফেয়ী মাযহাবী বলে মত ব্যক্ত করেছেন। {আল ইনসাফ=৬৭, তাবাকাতুশ শাফেয়িয়্যাহ-২/২, আবজাদুল উলুম—৮১০}
এমনিভাবে ইমাম মুসলিম রহঃ ছিলেন শাফেয়ী মাযহাবের অনুসারী। {আল হিত্তাহ-১৮৬}
নাসায়ী শরীফের সংকলক ইমাম নাসায়ী রহঃ ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহঃ এর মাযাহাবের অনুসারী ছিলেন।, ইমাম আবু দাউদ রহঃ, ও ছিলেন হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী। {ফয়জুল বারী-১/৫৮, আবজাদুল উলুম-৮১০, ইলাউল মুয়াক্কিয়ীন-১/২৩৬}
ইমাম তাহাবী রহঃ ছিলেন হানাফী মাযহাবের অনুসারী। যা তার সংকলিত তাহাবী শরীফ পড়লেই যে কেউ বুঝতে পারবে। এছাড়াও বাকি সকল মুহাদ্দিস হয়ত মুজতাহিদ ছিলেন, নতুবা ছিলেন মুকাল্লিদ কোন না কোন ইমামের।৷

কোনো একটি মাজহাবই কি মানতে হবেঃ

কুরআনে কারীম ৭টি কিরাতে নাজীল হয়েছে। কিন্তু একটি কিরাতে প্রচলন করেছেন হযরত উসমান রাঃ। যেটা আবু আসেম কুফী রহঃ এর কিরাত হিসেবে আজও আমাদের মাঝে প্রচলিত। এর কারণ ছিল বিশৃংখলা রোধ করা। যেন দ্বীনকে কেউ ছেলেখেলা বানিয়ে না ফেলে। আর সবার জন্য এটা সহজলভ্য হয়।
তেমনি একটি মাযহাবকে আবশ্যক বলা হয় এই জন্য যে, একাধিক মাযহাব অনুসরণের অনুমোদন থাকলে সবাই নিজের রিপু পূজারী হয়ে যেত। যেই বিধান যখন ইচ্ছে পালন করত, যেই বিধান যখন ইচেছ ছেড়ে দিত। এর মাধ্যমে মূলত দ্বীন পালন হতনা, বরং নিজের প্রবৃত্তির পূজা হত। তাই ৪র্থ শতাব্দীর উলামায়ে কিরাম একটি মাযহাবের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক বলে এই প্রবৃত্তি পূজার পথকে বন্ধ করে দিয়েছেন। যা সেই কালের ওলামায়ে কিরামের সর্বসম্মত সীদ্ধান্ত ছিল। আর একবার উম্মতের মাঝে ইজমা হয়ে গেলে তা পরবর্তীদের মানা আবশ্যক হয়ে যায়।

– হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর পর শুধুমাত্র হানাফী, মালিকী, শাফিয়ী ও হাম্বলী উক্ত চার মাযহাবেই (কুরআন ও হাদীসের বিশ্লেষন) তাক্বলীদ (অনুসরন) সীমাবদ্ধ হয়েছে। কেননা, চার মাযহাব ছাড়া অন্যান্য মুজতাহিদদের মাযহাব তেমন সংরক্ষিত হয়নি। ফলে আস্তে আস্তে সেসব মাযহাব বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।
[আহসানুল ফতোয়া ১/৪৪১, তাফসীরে আহমদী- ২৯৭, আল ইনসাফ- ৫২]

– ইমাম ইবনে তাইমিয়াও লাগামহীনভাবে যে মাযহাব মনে চায় সেটাকে মানা সুষ্পষ্ট হারাম ও অবৈধ ঘোষণা করেন। {ফাতওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া-২/২৪১}
তিনি আরও লিখেনঃ
“মুসলিম উম্মাহর ‘ইজ্মা’ উপেক্ষা করে মায্হাব চতুষ্টয়ের বিপরীতে কোন মায্হাব রচনা বা গ্রহণ বৈধ হবে না।” (ফাত্ওয়া-ইবনে তাইমিয়্যাঃ পৃ – ২/৪৪৬)

– ইমাম নববী (রহঃ) (মৃঃ ৬৭৬ হিঃ) যিনি সহীহ মুসলিম শারীফের ব্যাখ্যাকারী।। তিনি তার ‘রাওযাতুত তালেবীন’ নামক গ্রন্থে লিখেনঃ “উলামাগণ বলেন, ইজতিহাদে মুতলাক ইমাম চতুষ্টয় পর্যন্ত খতম হয়ে গেছে। তাই তাঁরা ইমাম চতুষ্টয়ের কোন একজনের ‘তাক্বলীদ’ মুসলিম উম্মাহর জন্য ওয়াজিব সাব্যস্ত করে দিয়েছেন। ইমামুল হারামাইন জুয়াইনী (মক্কা-মদীনা শরীফের ইমাম সাহেব – রহঃ, মৃঃ ৪৭৮ হিঃ)
বলেন মায্হাব চতুষ্টয়ের তাক্বলীদ ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে ইজমা উম্মতের উলামাগণ ইজমা করেছেন।”
(নুরুল হিদায়া হতে সংকলিত, পৃ – ১০; দেখুনঃ ফয়যুল কাদীরঃ পৃ – ১/২১০; শরহুল মুহায্যাব, নববীঃ পৃ – ১/৯১, আদাবুল মুস্তাফতী অধ্যায়)

– আল্লামা ইমাম ইবনে হাজার মক্কী (রহঃ) (মৃঃ ৯৭৩ হিঃ) তাঁর স্বীয় প্রসিদ্ধ কিতাব ‘ফাত্হুল মুবীন’ এ লিখেনঃ
“আমাদের যুগের বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আবু হানীফা, শাফেয়ী, মালেক ও আহমদ বিন হাম্বল – এ চার ইমাম ব্যতীত অন্য কারও তাক্বলীদ (অনুসরণ) জায়িয নয়।” (ফাত্হুল মুবীনঃ পৃ – ১৯৬)

– মুহাদ্দিসুল শিরোমনি,পাক-ভারতীয় উপমহাদেশের হযরত শাহ ওলীউল্লাহ দেহলভী (র) বলেনঃ
১. “আর তার মধ্যে অনেক উপকারিতা বিদ্যমান(অর্থাৎ কোন নির্দিষ্ট মাযহাব মেনে চলার মধ্যে ) যা সুস্পষ্ট ।বিশেষত বর্তমান যুগে ,যখন শক্তি-সামর্থ ( নিজে সরাসরি কুরআন-হাদিস বুঝে অনুসরণ করার ) হ্রাস পেয়ে গেছে। আর প্রত্যেক মতামত সম্পন্ন ব্যক্তি স্বীয় মতামতকেই বড় মনে করে চলেছে।” (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহঃ ১ম খন্ড-মিশরী ;১৩২ পৃষ্টা)
২. “মাযাহাব চতুষ্টয়কে গ্রহণ করার মধ্যে অতি আবশ্যই বিরাট ফায়দা রয়েছে । “(ইক্বদুলজীদঃ৩৬)
৩. “হারামাইন শরীফাইনে অবস্থান কালে প্রিয় নবীজির (সাঃ) কাছ থেকে আমি (ইলহাম বা স্বপ্নের মাধ্যমে) তিনটি জিনিস অর্জন করেছি ; যা আমার ধ্যান-ধারণা বিপরীত ছিল। তম্মেধ্যে দ্বিতীয়টি ছিল এই যে ,” যাতে আমি মুসলমানদের ওসীয়্যত করে যাই ; মাযহাব-চতুষ্টয়ের যে কোন একটিতে যেন তারা অন্তরভূক্ত হয় এবং আমি ও তা থেকে যেন বের না হই।“(ফুয়ূযুল-হারামাইনঃ ৬৫ পৃষ্টা)
৪. “সু-বিন্যস্ত গ্রন্থবদ্ধ এ চার মায্হাবের উপর সকল ইমামগণের ‘ইজ্মা’ তথা ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।” (হুজ্জাতুল্লাহিল বালেগাঃ পৃ – ১/১২৩)

এবার ইজমা সম্পর্কিত হাদীস দেখুনঃ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতকে কোন ধরণের ভ্রষ্টতায় ‘ইজমা’ বা ঐক্যবদ্ধ করবেন না। আল্লাহর কুদরতী হাত মুসলমানদের জামাআতের উপর। যারা মুসলমানদের পথের বিপরীত রাস্তা গ্রহণ করবে তারা বিচিত্রভাবে দোযখে যাবে।”
[তিরমিযীঃ পৃ – ৪/৪০৫, হাঃ ২১৬৭; মুস্তাদরাকে হাকিমঃ পৃ – ১/১১৬, হাঃ ৩৯৭,

বুখারী ও মুসলিম শরীফসহ অসংখ্য হাদীসগ্রন্থে হযরত আব্বাস (রঃ) সহ ১৭ জন সাহাবী (রঃ) থেকে সমার্থবোধক শব্দে বর্ণিত।]

এছাড়াও আবু দাউদ শারীফ, মুসতাদরাক শরীফ, আল-মারিফা গ্রন্থ সহ অনেক গ্রন্থে বলা আছে প্রত্যেক শতাব্দীতে মুজাদ্দিদ আসবেন যাঁরা দ্বীনের নব যৌবন দান করবেন এবং দ্বীনকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনবেন। এই পর্যন্ত যে সব মুজাদ্দিদ এসেছিলেন তাঁদের কেউই কোনো কালেই মাযহাবের বিরোধীতা করেন নি বরং সবাই কোনো না কোনো মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। আর এই মাযহবের বিরোধীতা শুরু করেছে এই সব থেকে বড় ফিতনা ফাসাদের যুগে এসে ওহাবী/সালাফী/আহলে হাদীস নামের একটি নির্দিষ্ট দল। সত্যিই প্রসংশা করার মতো এদের প্রতিভা ও ধর্মজ্ঞান! আর সব থেকে বড় কথা কুর’আন-হাদীসের ব্যাখ্যা খারেজী-মুতাজিলা সম্প্রদায়ের মত দিয়ে পুরো মুসলিম উম্মার ইজমাকে বাতিল প্রমানের চেষ্টা করাটাও কম দুঃসাহসের ব্যাপার নয়!

চলবে —————————

Copyright By: মুফতি মুফাসসির হিদায়াতুল্লাহ শেখ

About الفقه الحنفي الفقه الاكبر

বিদগ্ধ মুফতিয়ানে কেরামের দ্বারা পরিচালিত , সকল বাতিলের মুখোশ উন্মোচনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ , উলামায়ে আহনাফ এবং হানাফি মাজহাবের অনুসারীদের সরবাধুনিক মুখপাত্র ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ডটকম। আমাদের কারয্যক্রমঃ- ক) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ডটকম । খ) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট অনলাইন রিচার্স সেন্টার । গ) বাতিলের মোকাবেলায় সারা দুনিয়া ব্যাপি ইসলামিক সেমিনার ঘ) এবং মুনাজারায় অংশগ্রহণ । ঙ) হোয়াটএ্যাপ্স, টেলিগ্রাম, ভাইবার & সোমা চ্যাট ম্যাসেঞ্জারে ফিকহে হানাফীঃপ্রশ্ন-উত্তর গ্রুপ। আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনাঃ- ক) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট অফলাইন রিচার্স সেন্টার । খ) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ইউনিভার্সিটি । গ) হানাফী টিভি সহ আরও বহুমুখি প্রকল্প। আমাদের আবেদনঃ- এই বহুমুখি এবং বিশাল প্রকল্প-এর ব্যয়ভার কারও একার পক্ষে বহন করা খুবই দুঃসাধ্য ব্যপার। সুতারাং আপনি নিজে ও আপনার হিতাকাংখি দ্বীনের খেদমতে আগ্রহী বন্ধুদের নিয়ে মাসিক/বাতসরিক ও এককালীন সদস্য হিসেবে সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করে এগিয়ে আসবেন ; এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সাহায্য পাঠাবার ঠিকানাঃ- ১) সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, বয়রা শাখা, খুলনা Account Name: Md. Hedaytullah Account No: 2704501011569 ২) বিকাশঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩ ৩) এমক্যাশঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩৬ ৪) ডি,বি,বি,এল/রকেটঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩৮ Express Money Transfer:- Name Hedaytullah ID NO 6512895339162 সার্বিক যোগাযোগঃ- মুফতি মুফাসসির হিদায়াতুল্লাহ শেখ মোবাঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩ fiqhehanafithegreat@gmail.com