নামাজে পুরুষেরা নাভীর নিচে বাঁধবে হাত ; যদিও ভাই লা-মাজহাবীদের গাত্রদাহ ধরে যাক।।

সম্মানিত দ্বীনি বন্ধুগণ! আপনারা নিশ্চয় আপনারা লক্ষ্য করেছেন যে, বর্তমানে একদল ফেতনাবাজ সহীহ হাদীস মানার নাম করে , ফরজ-ওয়াজিব তরক করে, সুন্নৎ-মুস্তাহাবের ব্যাপারে সীমাহীন বাড়াবাড়ি তে লিপ্ত হয়ে সরলমনা সাধারণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতেছে।

নিশ্চয় প্রত্যেক সচেতন মুসলিমই এটা জানেন যে, নামাজে হাত বাঁধা সুন্নৎ । ফরজ বা ওয়াজিব নয়। কিন্ত আজ এই বিষয়টাকে এমন একটা জায়গা নিয়ে দাড় করানো হয়েছে যে, যেন সামান্য একটু হাত নড়ে গেলেই বুঝি নামাজ হবেনা।

তাই আজ পুরুষ দের নামাজে নাভীর নিচে হাত বাধার বিষয় দলীল সহ আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ । পাশাপাশি ওদের ভ্রান্তির কিছুটা জবাব দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।

নামাজে পুরুষেরা নাভীর নিচে বাঁধবে হাত ; যদিও ভাই লা-মাজহাবীদের গাত্রদাহ ধরে যাক।।

প্রথমতঃ

ডান হাত দ্বারা বাম হাতের 
কব্জি ধরা

وَقَالَ مُسَدَّدٌ حَدَّثَنَا يَحْيَى ثنا ثَوْرُ بْنُ يَزِيدَ عَنْ خَالِدِ بْنِ مَعْدَانَ عَنْ أَبِي زِيَادٍ مَوْلَى آلِ دَرَّاجٍ قَالَ ” مَا رَأَيْتُ فَنَسِيتُ فَإِنِّي لَمْ أَنْسَ أَنَّ أَبَا بَكْرٍ الصِّدِّيقَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ كَانَ إِذَا قَامَ فِي الصَّلَاةِ قَامَ هَكَذَا وَأَخَذَ بِكَفِّهِ الْيُمْنَى عَلَى ذِرَاعِهِ الْيُسْرَى لَازِقًا بِالْكُوعِ

হযরত
আবু যিয়াদ রা. বলেন:
আমি আর যাই কিছু ভুলি,
তবে এটা ভুলিনি যে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক
রা. যখন নামাযে দাঁড়াতেন
এভাবে দাঁড়াতেন। একথা
বলে তিনি ডান হাতের তালু
দ্বারা বাম হাতের কব্জির
সাথে মিলিত গিরা ধরতেন।
(আল মাতালিবুল আলিয়া: ৪৬০)

হাদীসটির স্তর : সহীহ,
মাউকুফ। আবু যিয়াদ
ব্যতীত এ হাদীসের রাবীগণ
সবাই-ই বুখারী/মুসলিমের রাবী।
আর আবু যিয়াদের
ব্যাপারে হযরত ইবনে
হাজার রহ.বলেন:
له إدراك. ذكر ابن أبي حاتم عن أبيه أنه روى عن أبي بكر الصّديق،
“তিনি রসূলুল্লাহ স. কে
পেয়েছেন। (অর্থাৎ, তিনি সাহাবা)
ইবনে আবী হাতেম তাঁর
পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে,
আবু যিয়াদ রা. হযরত
আবুবকর সিদ্দীক রা.
থেকে বর্ণনা করেন”।
(আল ইসাবা:রাবী নম্বর- ৩০০১)

সারসংক্ষেপ :
এ হাদীস
থেকে প্রমাণিত হয় যে,
হযরত আবু বকর সিদ্দীক
রা. নামাযে দাঁড়িয়ে
ডানহাতের তালু দ্বারা বাম
হাতের কব্জি ও তার সাথে
মিলিত অংশ ধরতেন। আর হযরত আবু বকর সিদ্দীকরা. এর আমল অবশ্যই
রসূলুল্লাহ স.-এর আমল থেকে
গৃহীত।

حَدَّثَنَا وَكِيعٌ ، قَالَ : حدَّثَنَا عَبْدُ السَّلاَمِ بْنُ شَدَّادٍ الْجُرَيري أَبُو طَالُوتَ ، عَنْ غَزْوَان بْنُ جَرِيرٍ الضَّبِّيُّ ، عَنْ أَبِيهِ ، قَالَ : كَانَ عَلِيٌّ إذَا قَامَ فِي الصَّلاَةِ وَضَعَ يَمِينَهُ عَلَى رُسْغِهِ ، فَلاَ يُزَالُ كَذَلِكَ حَتَّى يَرْكَعَ مَتَى مَا رَكَعَ إِلاَّ أَنْ يُصْلِحَ ثَوْبَهُ  أَوْ يَحُكَّ جَسَدَهُ.

হযরত জারীর যব্বী রহ.
থেকে বর্ণিত: হযরত আলী
রা. নামাযে দাঁড়ালে ডান হাত
বাম হাতের কব্জির ওপর রাখতেন।
রুকুতে যাওয়ার র্প্বূ পর্যন্ত তিনি হাত এভাবেই রাখতেন।
তবে কাপড় ঠিক করতে
বা শরীর চুলকানোর জন্য
সরাতে হলে ভিন্নকথা।
(ইবনে আবী শাইবা: ৩৯৬১)

হাদীসটির স্তর : হাসান,
মাউকুফ। এ হাদীসের রাবীগণের মধ্যে হযরত
ওয়াকী’ রহ. বুখারী-
মুসলিমের মাশহুর রাবী।
আব্দুস সালাম ثقةٌ
“নির্ভরযোগ্য”।
(তাকরীব: ৪৫৫৬),
গযওয়ান বিনজারীর
مقبول “গ্রহণযোগ্য”।
(তাকরীব: ৬০১৯) এবং জারীরও مقبول
“গ্রহণযোগ্য”।
(তাকরীব: ১০১৮)

ইমাম বুখারী রহ. এ হাদীস
টিকে সনদবিহীন এভাবে বর্ণনা করেছেন যে,
ووضع على رضى الله عنه كفه على رسغه الايسر الا ان يحك جلدا او يصلح ثوبا
আর হযরত আলী রা. আপন
বাম হাতের কব্জির ওপর
(ডান)হাতের তালু রাখতেন।
তবে শরীর চুলকাতে হলে বা কাপড় ঠিক করতে হলে
ভিন্ন কথা”।
(বুখারী শরীফ:নামাযের
মধ্যে হাত দ্বারা সাহায্য
গ্রহণ অধ্যায়, ১/১৫৯{মূল আরবী})

দুইজন বিখ্যাত সাহাবা
এবং খলীফায়ে রশেদের আমল থেকে প্রমাণিত হলো যে,
নামাযে দাঁড়িয়ে হাত ধরার
পদ্ধতি হলো ডান হাতের
তালু দ্বারা বাম হাতের
কব্জিও তার সাথে মিলিত
অংশ ধরা।

حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ ، قَالَ : أَخْبَرَنَا الحَجَّاجُ بْنُ حَسَّانَ ، قَالَ : سَمِعْتُ أَبَا مِجْلَزٍ ، أَوْ سَأَلْتُهُ ، قَالَ : قُلْتُ : كَيْفَ أَصْنَعُ ؟ قَالَ : يَضَعُ بَاطِنَ كَفِّ يَمِينِهِ عَلَى ظَاهِرِ كَفِّ شِمَالِهِ ، وَيَجْعَلُهَا أَسْفَلَ مِنَ السُّرَّةِ.

হাজ্জাজ বিন হাসসান রহ. বলেন: আমি হযরত আবু মিযলাজ রহ. কে বলতে শুনেছি যে, অথবা আমি তাঁকে
জিজ্ঞেস করেছি যে, আমি কীভাবে করব?
তিনি বললেন:
ডান হাতের পাঞ্জা বাম
হাতের পাঞ্জার ওপর রেখে
নাভির নীচে রাখবে।
(ইবনে আবীশাইবা: ৩৯৬৩)

হাদীসটির স্তর :
হাসান, মাকতু’। এ হাদীসের
রাবীদের মধ্যে ইয়াযীদ বিন
হারুন বুখারী-মুসলিমের রাবী। আর হাজ্জাজ বিন হাসসান صدوق
“সত্যনিষ্ঠ”।
(আল কাশেফ: ৯৩২)

সারসংক্ষেপ :
বিশিষ্ট তাবিঈ এবং
মুহাদ্দিস ও ফকীহ
হযরত আবু মিযলাজের
সিদ্ধান্ত থেকে জানা গেলো যে,
নামাযে ডান হাতের পাঞ্জা
বাম হাতের পাঞ্জার ওপর রাখতে হবে।

সাহাবায়ে কিরাম ও
তাবিঈদের পরবর্তী বিজ্ঞ
উলামায়ে কিরামের আমল দেখলে এ
বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করি। অতএব,
এ ব্যাপারে এখন সাহাবায়ে
কিরামের পরবর্তী যুগের
কয়েকজন বিশিষ্ট ইমামের
মন্তব্য পেশ করা হচ্ছে।

আল্লামা ইবনে কুদামা বলেন:

وَيُسْتَحَبُّ أنْ يَّضَعَهَا عَلى كُوْعِهِ وَمَا يُقَارِبُه

মুস্তাহাব হলো ডান হাত
বাম হাতের কব্জি এবং
তার নিকটবর্তী অংশে রাখবে।
(আল মুগনী: ‘নামাযেদাঁড়ানো
অবস্থায় হাত
রাখার স্থান’ নামক
মাসআলায়)

আল্লামা ইবনে হাযাম বলেন:

مَسْأَلَةٌ: وَيُسْتَحَبُّ أَنْ يَضَعَ الْمُصَلِّي يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى كُوعِ يَدِهِ الْيُسْرَى فِي الصَّلَاةِ، فِي وُقُوفِهِ كُلِّهِ فِيهَا…. وَرُوِّينَا فِعْلَ ذَلِكَ عَنْ أَبِي مِجْلَزٍ، وَإِبْرَاهِيمَ النَّخَعِيِّ، وَسَعِيدِ بْنِ جُبَيْرٍ، وَعَمْرِو بْنِ مَيْمُونٍ، وَمُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ، وَأَيُّوبَ السِّخْتِيَانِيُّ، وَحَمَّادِ بْنِ سَلَمَةَ: أَنَّهُمْ كَانُوا يَفْعَلُونَ ذَلِكَ وَهُوَ قَوْلُ أَبِي حَنِيفَةَ، وَالشَّافِعِيِّ، وَأَحْمَدَ، وَدَاوُد

মুসল্লী নামাযে দাঁড়ানো
অবস্থায় তার ডান হাত বাম
হাতের কব্জির ওপর রাখা মুস্তাহাব।
(একটু পরে গিয়ে তিনি বলেন:)
ইবরাহীম নাখঈ, সাঈদ বিন যুবাইর,আমর বিন মাইমূন, মুহাম্মাদ বিন সীরীন, আইয়ূব সিখতিয়ানী ও হাম্মাদ বিন
সালামা থেকে আমাদের
নিকটে অনুরূপ আমল
বর্ণিত হয়েছে । আর এটা
আবুহানীফা, শাফিঈ,
আহমাদ এবং দাউদ
জাহেরী রহ. এরও মত।
(আল মুহাল্লা: মাসআলা নম্বর- ৪৪৮)

আল্লামা শাওকানী বলেন:

وَالَحَدِيْثُ يَدُلُّ عَلى مَشْرُوْعِيَّةِ وَضْعِ الْكَفِّ عَلى الْكَفِّ وَإلَيْهَ ذَهَبَ الْجَمْهُوْرُ

এ সংক্রান্ত হাদীস থেকে
বুঝা যায় যে, পাঞ্জার ওপর
পাঞ্জা রাখা শরীআতসম্মত
এবং বিপুল সংখ্যক মানুষ
এ মত গ্রহণ করেছেন।
(নাইলুল আওতার: বাম হাতের ওপর ডান হাত রাখা অধ্যায়)

আবুল ওয়ালিদ আল বাজী বলেন:

قَوْلُهُ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ يَدَهُ الْيُمْنَى عَلَى ذِرَاعِهِ الْيُسْرَى يُرِيدُ أَنْ يَضَعَهَا عَلَى رَسْغِهِ لِأَنَّ يَدَهُ الْيُمْنَى لَا يَضَعُهَا عَلَى كَفِّ يَدِهِ الْيُسْرَى

হাদীসের ভাষ্য ‘ডান হাত
বাম জিরা’র ওপর রাখবে’-
এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো ডান
হাত বাম হাতের কব্জির ওপর রাখা। যেহেতু (পূর্ণ)
ডান হাত বাম হাতের পাঞ্জার ওপর রাখা যায় না।
(আল মুনতাকা শরহে মুয়াত্তা: ২/১৬৪)

অনুরূপ মন্তব্য আল্লামা
ইবনে তাইমিয়া থেকেও বর্ণিত রয়েছে। তাহলে পূর্ববর্তী
মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের আমল ও মন্তব্য থেকে
এটাই প্রমাণিত হলো যে, নামাযে দাঁড়িয়ে হাত ধরার পদ্ধতি হলো ডান হাতের তালু দ্বারা বাম হাতের
কব্জি ও তার সাথে মিলিত
অংশধরা।

বর্তমান আমাদের সমাজের
চিহ্নিত কিছু মানুষ সাহাবায়ে কিরাম, তাবিঈন,
তাবে তাবিঈন এবংপূর্ববর্তী মহামনীষীদের আদর্শ
ছেড়ে দিয়ে হাদীসের শব্দের ছত্রছায়ায় উম্মাতের মধ্যে নতুন
আমল সৃষ্টির চেষ্টা করে যাচ্ছে।
তারা বলে থাকে: ডান
হাতের জিরা তথা কনুই থেকে নিচের
অংশ বাম হাতের জিরার ওপর রাখতে হবে। তারা
নিজেদের দাবীর পক্ষে হযরত সাহল বিন সাআদ রা. থেকে বর্ণিত হাদীস দ্বরা দলীল গ্রহণের চেষ্টা করে থাকে।

حَدَّثَنَا عَبْدُ اللَّهِ بْنُ مَسْلَمَةَ، عَنْ مَالِكٍ، عَنْ أَبِي حَازِمٍ، عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ، قَالَ كَانَ النَّاسُ يُؤْمَرُونَ أَنْ يَضَعَ الرَّجُلُ الْيَدَ الْيُمْنَى عَلَى ذِرَاعِهِ الْيُسْرَى فِي الصَّلاَةِ (رَوَاهُ الْبُخَارِىُّ فِىْ بَابُ وَضْعِ اليُمْنَى عَلَى اليُسْرَى فِي الصَّلاَةِ)

হাদীস নম্বর-১২৬ : হযরত
সাহল বিন সা’দ রা.বলেন:
লোকদেরকে নির্দেশ দেয়া
হতো যে, নামাযে প্রত্যেকে ডান হাত বাম
হাতের জিরার ওপর রাখবে।
(বুখারী: ৭০৪)

এ হাদীস থেকে তাদের
বক্তব্য : উল্লিখিত হাদীসে
ডানহাতকে বাম হাতের জিরা’র ওপর রাখতে বলা হয়েছে।
আর জিরা’ হলো হাতের
কনুই থেকে নিচের অংশ। সে হিসেবে ডান হাতকে বাম
হাতের পূর্ণ জিরা’র ওপর রাখবে।

বিশ্লেষণ : এ হাদীসে জিরা’র ওপর হাত রাখতে হবে
কথাটি বলা হয়েছে তবে
পূর্ণ জিরা’ বা তার অংশবিশেষের ওপর
রাখতে হবে এমন কোন
কথা বলা হয়নি। আর সাধারণভাবে কোন একটি অঙ্গের নাম
উল্লেখ করে যেমনিভাবে
পূর্ণ অঙ্গ বুঝানো হয়ে থাকে,তেমনিভাবে উক্ত অঙ্গের অংশ বিশেষকেও বুঝানো হয়ে
থাকে। আল্লাহ  তাআলার
ইরশাদ:
أصابعهم فى اذانهم
“তারা কানের মধ্যে আঙ্গুল দেয়”। (বাকারা: ১৯)
এটা অত্যন্ত স্পষ্ট কথা যে,
কানের পূর্ণ ছিদ্রের মধ্যে
পূর্ণ আঙ্গুল কোনক্রমেই দেয়া
সম্ভব নয়। অথচ আল্লাহ
তাআলা এ আয়াতে পূর্ণ বা
আংশিক কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই কানে আঙ্গুল দেয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
উক্ত আয়াতে শব্দের
ব্যবহার থেকে এটা স্পষ্ট
হয় যে,
কোন অঙ্গের কথা উল্লেখ করে তার অংশ বিশেষ উদ্দেশ্য নেয়ার প্রচলন
কুরআনেও বিদ্যমান রয়েছে। সুতরাং উল্লিখিত হাদীসে পূর্ণ-অপূর্ণের ব্যাখ্যা বিহীন সাধারণভাবে ব্যবহৃত
‘জিরা’ শব্দের দ্বারা যদি ‘জিরা’র অংশবিশেষ অর্থাৎ হাতের কব্জি উদ্দেশ্য নেয়া হয় তাহলে কুরআন-হাদীসের কোন নিয়ম
লংঘন হবে না।
উপরন্তু, হযরত আলী রা. থেকে পূর্বে বর্ণনা করা
হয়েছে যে, তিনি বাম
হাতের কব্জির ওপর ডান হাতের তালু রাখতেন। আর
সাহাবায়ে কিরামের পরবর্তী যুগের বিজ্ঞ উলামায়ে কিরামের আমলও পূর্বে তুলে ধরা
হয়েছে। এসব কিছুর
ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে, পূর্ববর্তী কোন মুহাদ্দিস
হযরত সাহল বিন সাআদ রা.-
এর উক্ত হাদীসের ভিত্তিতে বাম হাতের পূর্ণ জিরার
ওপর ডান হাত রাখার
আমল করেননি; বরং এটা
নবসৃষ্ট পদ্ধতি যা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।

আর যদি জিরা’ শব্দ দ্বারা
পূর্ণ জিরা’ উদ্দেশ্য নেয়া হয়
তাহলে হাত দ্বারা অবশ্যই
পূর্ণ হাত উদ্দেশ্য হবে আর
পূর্ণ ডান হাত বাম হাতের জিরা’র ওপর রাখা কোনক্রমেই সম্ভব নয়।
তাহলে জিরা দ্বারা পূর্ণ
জিরা হাত দ্বারা আংশিক হাত
এটা কোন দলীলের অনুসরণে
করা হলো? নাকি উম্মাতের পূর্ববর্তী বিজ্ঞজনদের
দিকনির্দেশনা মান্য করা
হলো? বরং হাদীসের শব্দস্পষ্ট থাকলে তার অনুসরণ করা অন্যথায় উম্মাতের
পূর্ববর্তী বিজ্ঞজনদের থেকে
তার পদ্ধতি গ্রহণ করা
দরকার। এটাই ভ্রান্তি থেকে মুক্তির সঠিক পথ।

দ্বিতীয়তঃ ডান হাত দ্বারা বাম হাতের কব্জি ধরে নাভির নীচে রাখাঃ-

حَدَّثَنَا وَكِيعٌ ، عَنْ مُوسَى بْنِ عُمَيْرٍ ، عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، قَالَ : رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم وَضَعَ يَمِينَهُ عَلَى شِمَالِهِ فِي الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ.

হযরত ওয়াইল বিন হুজর রা. বলেন: আমি রসূলুল্লাহ স. কে নামাযের মধ্যে ডান হাত বাম হাতের ওপর নাভির নীচে রাখতে দেখেছি। (ইবনেআবী শাইবা: ৩৯৫৯)

হাদীসটির স্তর : সহীহ। মুসা বিন উমাইর ব্যতীত এ হাদীসের রাবীগণ সবাই-ই বুখারী-মুসলিমের রাবী।আর মুসা বিন উমাইর ثقةٌ “নির্ভরযোগ্য”। (তাকরীব:৭৮৭৪)

সারসংক্ষেপ : এ হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে,রসূলুল্লাহ স. নামাযে ডান হাত বাম হাতের ওপর রেখে নাভির নীচে রাখতেন।

ফায়দা : হাদীসে উল্লিখিত تحت السرة শব্দটি ইবনে আবী শাইবার মূল পান্ডুলিপিতে নেই বলে কোন কোন মুহাদ্দিস মন্তব্য করেছেন। কিন্তু আরবের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস শায়খ মুহাম্মাদ আউয়ামার অনুসন্ধান অনুযায়ী উক্ত শব্দটি মূল পান্ডুলিপিতে বিদ্যমান রয়েছে এবংপ্রমাণ হিসেবে তিনি মূল পান্ডুলিপির ফটোকপি কিতাবের শুরুতে পেশ করেছেন। (শায়খ মুহাম্মাদ আউয়ামার তাহকীকসহ ইবনে আবী শাইবার টিকায় বিস্তারিত দেখুন)

নামাযে হাত কোথায় বাঁধতে হবে- এ ব্যাপারে হযরত আলী রা. থেকে একটি মারফু’ হাদীস আবু দাউদ শরীফে বিদ্যমান আছে। হাদীসটি নিম্নরূপ:

حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ مَحْبُوبٍ حَدَّثَنَا حَفْصُ بْنُ غِيَاثٍ عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ إِسْحَاقَ عَنْ زِيَادِ بْنِ زَيْدٍ عَنْ أَبِي جُحَيْفَةَ أَنَّ عَلِيًّارضى الله عنه قَالَ السُّنَّةُ وَضْعُ الْكَفِّ عَلَى الْكَفِّ فِي الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ ‏(رَوَاه ابُوْ دَاود فِىْ بَابِ وَضْعِ الْيُمْنَى عَلَى الْيُسْرَى فِي الصَّلَاةِ)‏

হযরত আলী রা. বলেন: নামাযে নাভির নীচে বাম হাতের পাতার ওপর ডান হাতের তালু রাখা সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত। (আবু দাউদ: ৭৫৬)

হাদীসটির স্তর : হাসান লিগইরিহী তবে এই সনদটি জঈফ। এ হাদীসের মধ্যে আব্দুর রহমান বিন ইসহাকনামক রাবী জঈফ আর যিয়াদ বিন যায়েদ অপরিচিত হওয়ার কারণে অনেক মুহাদ্দিস হাদীসটিকে জঈফ বলেছেন। তবে ইমাম তিরমিজী রহ. আব্দুর রহমান বিন ইসহাকের বর্ণিত হাদীসকে হাসান বলেছেন।(তিরমিজী: ৭৩৯) উপরন্তু, হযরত আলী রা.-এর নিজের আমল নাভির নীচে হাত বাঁধা বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন ইবনে আবী শাইবা: ৩৯৬১,মুসনাদে আহমাদ: ৮৭৫, দারাকুতনী: ১১০২ ও১১০৩, সুনানুল কুবরা লিলবাইহাকী: ২৩৪০, ২৩৪১ও ২৩৪২। তন্মধ্যে ইবনে আবী শাইবার হাদীসটি হাসান। সব মিলে একটি সম্মিলিত শক্তি সৃষ্টি হয়। আর দ্বীনদার জঈফ রাবীর বর্ণিত হাদীসের পক্ষে সমর্থক বর্ণনা পাওয়া গেলে সেটাকে হাসান লিগইরিহী হিসেবেগণ্য হয়। (মুকাদ্দামায়ে মিশকাত: তাদরীবুর রাবী)

উল্লেখ্য : আবু দাউদ শরীফের চারটি সংকলন রয়েছে।তন্মধ্যে হিন্দুস্তানী মুদ্রণে আবুল কাসেম লুলুঈর সংকলনের অনুসরণ করা হয়েছে। আবু দাউদ শরীফের উক্ত সংকলনে এ হাদীসটি নেই। তবে হযরত ইবনে আরাবী, ইবনে দাসা এবং অন্যদের সংকলনে এ হাদীসটি বিদ্যমান রয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক অনুদিত আবু দাউদ শরীফে ও হাদীসটি রয়েছে। ইমাম মিজ্জী বলেন: هذا الحديث في رواية أبي سعيد بن الأعرابي وابن داسه وغير واحد عن أبي داود , ولم يذكره أبو القاسم. “এ হাদীসটি ইমাম আবুদাউদ রহ. থেকে আবু সাঈদ ইবনে আরাবী, ইবনে দাসা এবং অন্যান্যরা বর্ণনা করেছেন। তবে আবুল কাসেম এ হাদীসটি বর্ণনা করেননি”। (তুহফাতুলআশরাফ: হাদীস নম্বর- ১০৩১৪)

حَدَّثَنَا وَكِيعٌ ، عَنْ رَبِيعٍ ، عَنْ أَبِي مَعْشَرٍ ، عَنْ إبْرَاهِيمَ ، قَالَ : يَضَعُ يَمِينَهُ عَلَى شِمَالِهِ فِي الصَّلاَةِ تَحْتَ السُّرَّةِ.

হযরত ইবরাহীম নাখঈ রহ.বলেন: নামাযে ডান হাত বাম হাতের ওপর রেখে নাভির নীচে রাখবে। (ইবনে আবী শাইবা: ৩৯৬০)

হাদীসটির স্তর : হাসান, মাকতু’। রবী’ ব্যতীত এ হাদীসের রাবীগণ সবাই-ই বুখারী/মুসলিমের রাবী।আর রবী’র ব্যাপারে হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন:صدوق سىء الحفظ ، و كان عابدا مجاهدا “তিনি সত্যনিষ্ঠ, আবেদ এবং মুজাহিদ; তবে স্মৃতিশক্তি খারাপ”। (তাকরীব: ২০৭৩)

حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ قَالَ أَخْبَرَنَا الحَجَّاجُ بْنُ حَسَّانَ ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا مِجْلَزٍ أَوْ سَأَلْتُهُ ، قَالَ : قُلْتُ كَيْفَ أَصْنَعُ ؟ قَالَ يَضَعُ بَاطِنَ كَفِّ يَمِينِهِ عَلَى ظَاهِرِ كَفِّ شِمَالِهِ ، وَيَجْعَلُهَا أَسْفَلَ مِنَ السُّرَّةِ.

হাজ্জাজ বিন হাসসান রহ. বলেন:আমি হযরত আবু মিজলায রহ.কে বলতে শুনেছি যে, অথবা আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছি যে, আমি কীভাবে করব? তিনি বললেন: ডান হাতের পাঞ্জা বাম হাতের পাঞ্জার ওপর রেখে নাভির নীচে রাখবে। (ইবনে আবীশাইবা: ৩৯৬৩)

হাদীসটির স্তর : হাসান, মাকতু’। এ হাদীসেররাবীদ্বয়ের মধ্যে ইয়াযীদ বিন হারুন বুখারী-মুসলিমেররাবী। আর হাজ্জাজ বিন হাসসান صدوق “সত্যনিষ্ঠ”। (আল কাশেফ: ৯৩২)

সারসংক্ষেপ : বিশিষ্ট দু’জন তাবিঈ এবং মুহাদ্দিস ও ফকীহ হযরত ইবরাহীম নাখঈ এবং হযরত আবু মিজলায রহ.-এর সিদ্ধান্ত থেকে জানা গেলো যে, নামাযে হাত রাখতে হবে নাভির নীচে।

উল্লেখ্য, নামাযের মধ্যে হাত কোথায় বাঁধতে হবে, এব্যাপারে বিভিন্ন রকম আমল বর্ণিত আছে। নাভি বরাবর, নাভির উপরে ও নাভির নীচে। বুকের ওপরে হাত বাঁধার স্পষ্ট কোন সহীহ হাদীস সিহাহ সিত্তার ভিতরে বা বাইরে কোন কিতাবে নেই। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক অনুদিত আবু দাউদ শরীফের ৭৫৯ নম্বর হাদীসে হযরত তাউস রহ. বুকেরওপর হাত বাঁধাকে রসূলুল্লাহ স.-এর আমল বলে বর্ণনাকরেছেন। কিন্তু সাহাবার মাধ্যম না থাকায় হাদীসটি মুরসাল। আমরা মুরসাল হাদীসকে দলীল হিসেবে স্বীকার করি। তবে ইবনে আবী শাইবার ৩৯৫৯ নম্বরে সহীহ সনদে বর্ণিত হযরত ওয়ায়েল বিন হুজ্র রা.-এর হাদীসের বিপরীত হওয়ায় আমরা তাউস রহ.-এর বর্ণিত হাদীসটিকে অপ্রবল মনে করি। কিন্তু যারা এর দ্বারা দলীল দেয় তারা মুরসাল হাদীসকে দলীল যোগ্য মনে করে না। সহীহ ইবনে খুযাইমার ৪৭৯ নম্বরে বুকের ওপর হাত বাঁধার একটি স্পষ্ট হাদীস বর্ণিত থাকলেও হাদীসটি জঈফ। উক্ত হাদীসের বর্ণনাকারী মুআম্মাল বিন ইসমাঈল রিজাল শাস্ত্রের ইমামগণের নিকটে বিতর্কিত। ইমাম বুখারী রহ. তাঁকে মুনকারুল হাদীস বলেছেন। শায়খ শুআইব আরনাউত হাদীসটিকে জঈফ বলেছেন। (মুসনাদে আহমাদ:১৮৮৭১ নম্বর হাদীসের আলোচনায়) শায়খআলবানীও হাদীসটিকে জঈফ বলেছেন। (ইবনেখুযাইমা: ৪৭৯ নম্বর হাদীসের তাহকীকে) মুসনাদে আহমাদের ২১৯৬৮ নম্বর হাদীসে হযরত হুলাব রা.থেকে বুকের ওপর হাত বাঁধার একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। উক্ত হাদীসের সনদে কবীসা নামক রাবীকেশায়খ শুআইব আরনাউত অপরিচিত মন্তব্য করে হাদীসটির সনদ জঈফ বলেছেন। আর উক্ত হাদীসের অন্নান্য বর্ণনা পেশ করে বুকের ওপর হাত রাখার অংশটিকে জঈফ বলেছেন। তিনি আরও বলেন: وقول الألباني رحمه الله في صفة الصلاة: وضعهما على الصدر هو الذي ثبت في السنة، تعنُّت لا وجه له، “শায়খ আলবানী রহ. ‘সিফাতুস সলাত’ কিতাবে বুকের ওপর হাতবাঁধাকে বহাল সুন্নাত বলে যে মন্তব্য করেছেন সেটানিছক একগুঁয়েমী”। (মুসনাদে আহমাদ: ২১৯৬৮ নম্বরহাদীসের আলোচনায়) এ কারণে হয়তো চার ইমামসহকোন বিজ্ঞ ফকীহ বা মুহাদ্দিস বুকের ওপর হাত বাঁধার আমল গ্রহণও করেননি। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ.বলেন: নামাযে হাত বেঁধে কোথায় রাখতে হবে তানিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। ইমাম আহমাদ রহ. থেকে নাভি বরাবর, নাভির উপরে এবং নাভির নীচে তিনটি মতই বর্ণিত হয়েছে। (বাদায়েউল ফাওয়ায়েদ: ৩/৯১)ইমাম আহমাদের মতো জগদ্বিখ্যাত মুহাদ্দিসও বুকেরওপর হাত বাঁধার কোন মত পেশ করেননি। অবশ্য সতর সংরক্ষণে বেশী কার্যকর হওয়ায় নারীদেরকে আমরা উক্ত আমলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে থাকি।

মহিলাদের হাত বাঁধা সম্পর্কিত লেখা আসছে………

Copyright By: মুফতি মুফাসসির হিদায়াতুল্লাহ্ শেখ

About الفقه الحنفي الفقه الاكبر

বিদগ্ধ মুফতিয়ানে কেরামের দ্বারা পরিচালিত , সকল বাতিলের মুখোশ উন্মোচনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ , উলামায়ে আহনাফ এবং হানাফি মাজহাবের অনুসারীদের সরবাধুনিক মুখপাত্র ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ডটকম। আমাদের কারয্যক্রমঃ- ক) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ডটকম । খ) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট অনলাইন রিচার্স সেন্টার । গ) বাতিলের মোকাবেলায় সারা দুনিয়া ব্যাপি ইসলামিক সেমিনার ঘ) এবং মুনাজারায় অংশগ্রহণ । ঙ) হোয়াটএ্যাপ্স, টেলিগ্রাম, ভাইবার & সোমা চ্যাট ম্যাসেঞ্জারে ফিকহে হানাফীঃপ্রশ্ন-উত্তর গ্রুপ। আমাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনাঃ- ক) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট অফলাইন রিচার্স সেন্টার । খ) ফিকহে হানাফী দ্যা গ্রেট ইউনিভার্সিটি । গ) হানাফী টিভি সহ আরও বহুমুখি প্রকল্প। আমাদের আবেদনঃ- এই বহুমুখি এবং বিশাল প্রকল্প-এর ব্যয়ভার কারও একার পক্ষে বহন করা খুবই দুঃসাধ্য ব্যপার। সুতারাং আপনি নিজে ও আপনার হিতাকাংখি দ্বীনের খেদমতে আগ্রহী বন্ধুদের নিয়ে মাসিক/বাতসরিক ও এককালীন সদস্য হিসেবে সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করে এগিয়ে আসবেন ; এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সাহায্য পাঠাবার ঠিকানাঃ- ১) সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, বয়রা শাখা, খুলনা Account Name: Md. Hedaytullah Account No: 2704501011569 ২) বিকাশঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩ ৩) এমক্যাশঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩৬ ৪) ডি,বি,বি,এল/রকেটঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩৮ Express Money Transfer:- Name Hedaytullah ID NO 6512895339162 সার্বিক যোগাযোগঃ- মুফতি মুফাসসির হিদায়াতুল্লাহ শেখ মোবাঃ- +৮৮০১৯২৩৮৭১২৯৩ fiqhehanafithegreat@gmail.com